Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৭ আশ্বিন ১৪২৪, ০১ মুহাররম ১৪৩৮ হিজরী
শিরোনাম

দাম কমবে না ইন্টারনেটের

চালু হয়েছে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

চালু হয়েছে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল। গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ‘সি-মি-উই-৫’ উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে নতুন করে আরও ১৫০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ পাবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) বলছে, সাবমেরিন ক্যাবল ওয়ানের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্টেশন। এতে নিরবিচ্ছন্ন ও দ্রæতগতির ইন্টারনেটের আওতায় আসবে দক্ষিণাঞ্চলসহ পুরো দেশ। দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যান্ডউইথ সরবরাহ শুরু হওয়ার ফলে ব্যান্ডউইথের নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে বিএসসিসিএল। বর্তমান মূল্যের ২০ শতাংশ পর্যন্তও কমানো হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ জানানো হয়েছে। তবে ব্যান্ডউইথের দাম কমলেও তা গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত কোন প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন ইন্টারনেট সেবাদানকারী (আইএসপি) প্রতিষ্ঠানগুলো। ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি’র পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ব্যান্ডউইথের দাম কমালেও গ্রাহক পর্যায়ে তার কোন প্রভাব পড়বে না। তবে গতি আগের তুলনায় কিছুটা বাড়বে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পঞ্চম সাবমেরিন ক্যাবলে (বাংলাদেশের দ্বিতীয়) যুক্ত হওয়ায় নতুন করে আরও ১৫০০ গিগাবাইট ব্যান্ডউইথ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উদ্বোধনের দিন থেকে ২০০ জিবিপিএস (গিগাবাইট পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইথ পাচ্ছে। পর্যায়ক্রমে তা ১ হাজার ৫০০ জিবিপিএসে উন্নীত হবে। নতুন এই ব্যান্ডউইথ যুক্ত হলে বাংলাদেশে বাড়বে ইন্টারনেট সেবার মান এবং মূল্য অনেকাংশেই কমে যাবে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এর আগেও ইন্টারনেট সেবার খরচ কমাতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেয়ার পর ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে তা পৌছেনি। বরং ইন্টারনেট সেবার মূল্য ও গতি নিয়ে সব সময় অভিযোগ করে আসছেন গ্রাহকরা। কাক্সিক্ষত মূল্যে ইন্টারনেট সেবা এবং নির্দিষ্ট গতি না দেয়ার জন্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও অপারেটরদেরই দায়ি করে আসছেন তারা। এর আগে কয়েকদফা ব্যান্ডউইথের দাম কমালেও তা গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছেনি। এবারও তার পূনরাবৃত্তি হবে বলে মনে করছেন তারা। বিএসসিসিএল সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে প্রতি মেগা ব্যান্ডউইথ বিক্রি হতো ৭২ হাজার টাকায়, ২০০৯ সালে ১২ হাজার টাকা, ২০১১ সালে ১০ হাজার টাকা, ২০১২ সালে ৮ হাজার টাকা এবং বর্তমানে ৬২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত ১০ বছরে প্রতি মেগা ব্যান্ডইউথে দাম কমেছে ৭১ হাজার ৩৭৫ টাকা। তবে ব্যান্ডউইথের এই মূল্য কমানোর সাথে সাথে ইন্টারনেটের মূল্য কমানো কিংবা উন্নতমানের সেবা দেবার ক্ষেত্রে ততটা অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে ব্যান্ডউইথের এর দামের সঙ্গে ইন্টারনেটের দাম কমার সম্পর্ক খুবই কম। কারণ ব্যান্ডউইথ কিনতে তাদের যে টাকা খরচ হয় তা ইন্টারনেট সেবাদানের মোট খরচের মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ। ফলে ব্যান্ডউইথ ফ্রি করে দিলেও তা ইন্টারনেটের দামের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানি করতে অন্তত ১৬টি পক্ষ জড়িত থাকে। এদের মধ্যে রয়েছে- ইন্টারনেট ট্রানজিট (আইপি ক্লাউড), বিদেশি ডাটা সেন্টারের ভাড়া, দেশি-বিদেশি ব্যাকহল চার্জ, ল্যান্ডিং স্টেশন ভাড়া, কেন্দ্রীয় সার্ভারের পরিবহন খরচ, গেইটওয়ে ভাড়া, আইএসপি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ভাড়া, ইন্টারনেট যন্ত্রাংশের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ধার্য করা ভ্যাট ও শুল্ক, বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগি ইত্যাদি। শুধু ব্যান্ডউইথ নয়, এসব পক্ষগুলোর সেবাচার্জ আনুপাতিক হারে কমালেই কেবল ইন্টারনেটের দাম বর্তমানের চেয়ে আরও কমানো সম্ভব বলে তারা জানান।
এদিকে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাতে কিছুদিন আগে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। প্রস্তাবিত ইন্টারনেটের মূল্যসীমা কার্যকর হলে ঢাকায় ইন্টারনেটের দাম না কমলেও গতি বাড়বে বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও কমবে। ঢাকায় বর্তমানের চেয়ে গতি অনেক বাড়তে পারে। আর ঢাকার বাইরে বর্তমানের অর্ধেক দামে মিলতে পারে ইন্টারনেট। আইএসপিএবির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) ও এনটিটিএনগুলোর ব্যান্ডউইথ, পরিবহন ও সেবাচার্জে সিলিং করে না দিলে গ্রাহকপর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমানো যাবে না। এ কারণে সংগঠনটি তাদের প্রস্তাবনায় আইআইজি ও এনটিটিএন-এর চার্জের ওপর সিলিং করার প্রস্তাব দিয়েছে। জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, ঢাকায় ইন্টারনেটের যা দাম হওয়া উচিত তার চেয়ে কমই আছে। কারণ, ট্রান্সমিশন চার্জ (ব্যান্ডউইথের পরিবহন খরচ) বেশি। তাই শুধু ট্রান্সমিশন খরচ কমানো গেলেই ইন্টারনেটের দাম কমানো সম্ভব।’ আমিনুল হাকিম বলেন, ‘আমরা ব্যান্ডউইথ কিনতেই মোট ব্যয়ের ৫ ভাগ খরচ করি। বাকী ৯৫ ভাগ খরচ হয়, ট্রান্সমিশন, অফিস ভাড়া, কর্মীদের বেতন, বিটিআরসি’র রাজস্ব, বিদ্যুৎ বিল, এনটিটিএন খরচসহ বিভিন্ন ধরনের খরচ। ফলে ব্যান্ডউইথের দাম কমা মানেই কিন্তু ইন্টারনেটের দাম কমা নয়।’
জানতে চাইলে বিএসসিসিএল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মনোয়ার হোসেন বলেন, ব্যান্ডউইথের দাম পুনঃনির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের ব্যান্ডউইথ পাওয়া শুরু হয়েছে। তবে ঠিক কি পরিমাণ দাম কমানো হবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বর্তমানে বিএসসিসিএলের একটি অফারের হিসেবে ১০ জিবিপিএস ভলিউমের একটি ব্যন্ডউইথের পাইকারি মূল্য প্রতি এমবিপিএস ৫৬২ টাকা। নতুন প্যাকেজগুলো অন্তত ১০ জিবিপিএস হবে বলে জানান মনোয়ার।
এর আগে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের সাথে যুক্ত হওয়ার ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যান্ডউইথের দাম আরও একটু কম করা হবে। বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, খুলনা, যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ইন্টারনেট সেবা আরও স্বল্পমূল্যে দেওয়া যাবে
মূল্য কমাতে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা: বাংলাদেশে ইন্টারনেটের মূল্য কমাতে কাজ শুরু করেছে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন জমা দিলেই কমে যেতে পারে ইন্টারনেটের মূল্য। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় বেশি উল্লেখ করে এ সেবা আরও কম খরচে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই সেবা কম মূল্যে দেয়ার জন্য উপায় খুঁজছে সংশ্লিষ্টরা। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি বৃটিশ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশের ইন্টারনেট মার্কেট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কাজ দেয়া হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে ইন্টারনেট মার্কেট এই সেবায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় ও গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিবে। প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করেই নতুন করে ইন্টারনেটের মূল্য নির্ধারণ হবে বলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশে ইন্টারনেটের মূল্য বেশি বলে অনেকে অভিযোগ করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ইন্টারনেট সেবা কম খরচে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সে আলোকে বাংলাদেশের বাজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার জন্য একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে। তারা মার্কেট পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দিবে যে, কত কম মূল্যে আমরা এই সেবা দিতে পারি। তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেই ইন্টারনেটের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর