Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭, ০৯ কার্তিক ১৪২৪, ০৩ সফর ১৪৩৯ হিজরী

আল-কুরআনে নৃবিজ্ঞানের তাত্তি¡ক বিশ্লেষণ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান | প্রকাশের সময় : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
নৃবিজ্ঞান মানুষের দৈহিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও বিকাশ প্রক্রিয়া নিয়ে অর্ন্তদৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করে থাকে। পৃথিবীর সাম্রাজবাদী ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা, জাপান ইত্যাদি বিভিন্ন দেশ সমূহে উপনিবেশ স্থাপন করে, সে দেশ থেকে মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করেছে। এডওয়ার্ড উবিøউ সাঈদ একজন প্রচ্যতত্ত¡বিশারদ। তিনি তার (ঙৎরবহঃহষরংস) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, উপনিবেশবাদী সাম্রাজ্যতদবাদীরা এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার মানুষদেরকে হীনভাবে চিত্রায়িত করেছে। অথচ মানবের সাংস্কৃতিক ও মনুষ্যত্বগত মর্যাদায় মানুষ তো সমমর্যাদার অধিকারী। প্রজ্ঞা ও প্রযুত্তির সমন্বয়ে অনুন্নত অর্থনীতির মানুষও উন্নত অর্থনীতি ও রুচি-সংস্কৃতিবোধে উন্নীত হতে পারে। বর্তমান বিশ্বের আন্তর্জাতিকতাবাদ হলো এককেন্দ্রিক মার্কিনি শাসন প্রভাবিত আন্তর্জাতিকতাবাদ। নৃবিজ্ঞান পৃথিবীর প্রতিটি দেশের মানুষের মানবিক, সাংস্কৃতিক ও শৈক্ষিক উৎকর্য- বিধানে কার্যকর একটি বিদ্যা। সেজন্য আর্থ সামাজিক, ধর্মীয় রাজনৈতিক, বর্ণগত ও ভাষিক পার্থক্য দেখিয়ে গরিব দেশকে বিশ্বয়নের (মষড়নধষরুধঃরড়হ) নামে শোষণ করার দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে অবস্থান হলো নৃবিজ্ঞানের। এজন্য নৃবিজ্ঞানের জাতিতাত্তি¡ক, সংস্কৃতিকতাত্তি¡ক জ্ঞানের নৈতিক সূ²তা বিশ্বকে সাম্রাজ্যবাদের অন্যায় ও নেতিবাচক খপ্পর থকে বাঁচানোর ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে সেজন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে সৎ ও দূরদর্শী নৈতিক সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্বের নেতৃত্ব অতীব জরুরি বলে আমি মনে করি।
পরিবার হলো একটি সমাজের আদি-প্রতিষ্ঠান। পরিবারের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানুষের বংশরক্ষা হয়ে আসছে। আদিম সমাজে একপতœী বিবাহ (গড়হড়মধসু), বহুপতœী বিবাহ (ঢ়ড়ষুমধসু), এবং বহুপতি বিবাহ (চড়ষুধহফৎু) প্রথা দেখতে পাওয়া যায়। একজন স্ত্রীর একাধিক স্বামী থাকার বিবাহ ব্যবস্থাটির মধ্যে সন্তানের পিতা নির্ধারণ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয় বলে নৈতিকভাবে এই বিবাহ প্রথা গ্রহণযোগ্য রাখে না। পারিবারিক পরিবেশের শৃঙ্খলা ও সুন্দরতা থাকলে রাষ্ট্রীয় পরিবেশ এবং সামাজিক সংগঠনেও নৈতিকতা সুন্দরতা ও শান্তি স¤প্রীতি নিশ্চিত হতে বাধ্য। পাশ্চাত্যে পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাবার ফলে সে সমাজে হত্যা, ব্যভিচার, বিশৃঙ্খলা, এইডস, জারজ সন্তানের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পারিবারিক সামাজিক সমস্যা চরম সঙ্কট আকার ধারণ করেছে। ইসলাম ধর্ম যে পরিবার কেন্দ্রিকতা ও বিবাহ এবং নৈতিকতার বিধান দিয়ে সমাজ সংগঠনকে মজবুত ভিত্তি দিয়েছে পাশ্চাত্যে সমাজবিজ্ঞারনীরা এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন। মানবের দৈহিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় নৈতিক-সাস্কৃতিক সুদূরপ্রসারী বুদ্ধিবৃত্তিকতার চর্চাকে নিশ্চিত করতে পারলে বিশ্বসমাজ একটি সংহতি লাভ করবে বলে প্রাজ্ঞজনরা স্বীকার করবেন।
ধর্ম সম্পর্কে ফরাসি বিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের সংজ্ঞাটি প্রণিধানযোগ্য: অ ৎবষরমরড়হ রং ঁহরভরবফ ংুংঃবস ড়ভ নবষরবভং ্ ঢ়ৎধপঃরপবং ৎবষধঃরাব ঃড় ংধপৎবফ ঃযরহমং...... নবষরবভং ঢ়ৎধপঃরপবং যিরপয ঁহরঃব রহঃড় ধ ংরহমষব ড়ৎধষ পড়সসঁহরঃু ... ধষষ ঃযড়ংব যিড় ধফযবৎব ঃড় ঃযবস. অর্থ্যাৎ “ধর্ম হলো বিশ্বাস ও চর্চার সমন্বিত পবিত্র বস্তু; যা নির্দিষ্ট নৈতিক স¤প্রদায়কে উদ্বোধিত করে। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানের জনক ই. বি টাইলর (১৮৩২-১৯৭১) ধর্মের উৎপত্তিকে স্বপ্নের অভিজ্ঞতা ও মৃত্যুর চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। কারণ স্বপ্নের অভিজ্ঞতার পথ বেয়ে মানুষ আত্মা বা পেতাত্মার ধারণায় উপনীত হয় বলে তিনি মনে করেন। সর্বপ্রাণবাদ (অহরসরংস)থেকে বিবর্তনের ক্রমধারায় প্রকৃতি পূজা ও একেশ্বরবাদ বিকাশ লাভ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। শুধু স্বপ্ন নয়; গভীরতম সজ্ঞার বা অনুধ্যানের (ওহঃঁরঃরড়হ) মাধ্যমে আত্মরূপ স্বর্গীয় ধারণায় মানুষ পৌছাতে পারে বলে প্রাজ্ঞজনরা মত প্রকাশ করে থাকেন। প্রকৃতির বস্তু ও প্রাণীর স্রষ্ট্রা একজনই আর তখনই মানুষ একেশ্বরবাদের দিকে ধাবিত হয়।
সমাজতাত্তি¡ক কাল মার্কস বলেছেন, ধর্ম মানুষকে মানবিক সত্ত¡া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আসলে ধর্ম গরিব লোকের আফিম (ওঃ রং ঃযব ড়ঢ়রঁস ড়ভ ঃযব ঢ়ড়ড়ৎ) নয়; বরং উদারদৃষ্টির ধর্মপ্রাণতার স্বভাব মানুষকে প্রকৃত মানবিক সত্ত¡ার সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত করে বলে আমি মনে করি। (চলবে)

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।