Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌
শিরোনাম

আ.লীগ বিএনপি ও এলডিপির হেভিওয়েট প্রার্থীরা ভোটের আগেই মনোনয়ন যুদ্ধে অবতীর্ণ

কুমিল্লা-৭ : চান্দিনার নির্বাচনী হাওয়া

| প্রকাশের সময় : ৩ অক্টোবর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

কুমিল্লা থেকে সাদিক মামুন : কুমিল্লায় কৃষিপণ্য উৎপাদনের অন্যতম এলাকা চান্দিনা। তাই কৃষকের মনের ভাষা আর সাধারণ মানুষের সেন্টিমেন্ট ও দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের যিনি বুঝতে পারেন এবং মূল্যায়ন করতে জানেন; তিনিই চান্দিনা থেকে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। চান্দিনায় যে কোনো দলের প্রার্থী জয়ের ক্ষেত্রে ওই বিষয়গুলোই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। এদিকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও এলডিপির চার প্রার্থীর প্রচারণা ও লবিং ঘিরে এখন থেকেই কুমিল্লা-৭ চান্দিনা আসনে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আমেজ বইছে। আওয়ামী লীগ থেকে চান্দিনায় এমপি আলী আশ্রাফ না-কি ডা. প্রাণগোপাল নৌকার মাঝি হবেন এটি নিশ্চিত হওয়াটা যেমন কঠিন, তেমনি বিএনপি এ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে খোরশেদ আলম না-কি জোটের শরীক এলডিপির রেদোয়ান আহমেদকে প্রার্থী দেবে এটা নিয়েও দুই দলের স্থানীয় নেতাদের কেউই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চান্দিনায় বিএনপি ও এলডিপির ঐক্যে যে-ই প্রার্থী হন তাহলে আওয়ামী লীগের জয় ঘরে তোলাটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তবে আওয়ামী লীগ কৌশলী ভ‚মিকায় থাকলে বিএনপিজোট বেকায়দায় পড়বে।
চান্দিনা উপজেলার একটি পৌরসভা এবং ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৭ আসনে বর্তমানে আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি অধ্যাপক আলী আশ্রাফ। তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে এ আসন থেকে পাঁচবার এমপি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদে মনোনিত হন। চান্দিনা আওয়ামী লীগে প্রকাশ্যে কোনোরকম কোন্দল না থাকলেও বিভিন্ন ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা এখনো দূর হয়নি। চান্দিনার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পুরাতন রাস্তাঘাটের সংস্কার ও মেরামত এবং নতুন রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। তবে পৌরসভার কয়েকটি এলাকার রাস্তাঘাটের বেহাল দশায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের জন্য দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রæতির অধিকাংশই বাস্তবায়িত হয়েছে বলে মনে করেন এমপি সমর্থিত আওয়ামী লীগ নেতারা। তৃণমূল নেতারা জানান, চান্দিনা আওয়ামী লীগে কোনো দ্ব›দ্ব-কোন্দল নেই। তবে মূল্যায়ন-অবমূল্যায়নের প্রশ্নে মান-অভিমান রয়েছে। এমপি অধ্যাপক আলী আশ্রাফ একজন শিক্ষাবিদ, ওনাকে বুঝতে হবে; ত্যাগী নেতাকর্মীরা আখের গোছানোর রাজনীতি করে না।
এদিকে আগামী নির্বাচনেও নৌকার টিকিট প্রত্যাশা করছেন আলী আশ্রাফ। ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া আওয়ামী লীগের এ প্রবীণ নেতা আসন্ন একাদশ নির্বাচনেও দলের মনোনয়ন চাইবেন। চান্দিনা আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই জানান, লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে দলের জন্য তিনি আজীবন করেছেন। চান্দিনাবাসীর উন্নয়নে অধ্যাপক আলী আশ্রাফের অবদান অনস্বীকার্য। আগামীতে মনোনয়ন প্রাপ্তিতে দল আলী আশ্রাফকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে বলে বিশ্বাস স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের। অপরদিকে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার আশায় এখন থেকেই নিজেদের মতো করে মাঠ গোছাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত চিকিৎসক ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডা. প্রাণগোপাল দত্ত ও চান্দিনা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নাজনীন আক্তার। আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্য সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি চান্দিনার মহিচাইল গ্রামের সন্তান ডা. প্রাণগোপাল দত্ত চান্দিনায় যাতায়াত বাড়িয়ে দিয়েছেন। চান্দিনায় আওয়ামী লীগের শত্রæ আওয়ামী লীগ এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি। সম্প্রতি কুমিল্লা শহরে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কাছে আগামী সংসদ নির্বাচনে চান্দিনা থেকে প্রার্থী হওয়ার আশা ব্যক্ত করে প্রাণগোপাল দত্ত বলেছেন, চান্দিনাবাসীর সেবা করার লক্ষ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি কুমিল্লা-৭ চান্দিনা আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চান। তবে দলীয় প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দিলেই তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। তিনি বলেছেন, চান্দিনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নিজেরাই দ্ব›েদ্ব জড়াচ্ছে। একে অপরের নামে মামলা দিচ্ছে। চান্দিনায় পড়ালেখার মান কমে গেছে। এখানে দপ্তরি নিয়োগেও বাণিজ্য হয়। অপরদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নের আশায় এখন থেকেই লবিং শুরু করেছেন চান্দিনার নারীনেত্রী ও কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজনীন আক্তার। আওয়ামী লীগে প্রত্যাশী তিনজনের কে পাবেন নৌকা; এ নিয়ে মনোনয়নপ্রাপ্তির সমীকরণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে চান্দিনায় বিএনপির অভিভাবক মানেই খোরশেদ আলম। তৃণমূলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে খোরশেদ আলমের। তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা ও চান্দিনা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিএনপি থেকে প্রার্থী হন। ওই নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যাপক আলী আশ্রাফের কাছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। দলের হাইকমান্ডের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন তার মনোনয়নের বিষয়টি। আগামীতে তিনি বিএনপির টিকিটে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছেন। বিএনপির সুসময়, দুঃসময়েও খোরশেদ আলম দলের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করেছেন, এখনো করছেন। চান্দিনায় কোন্দলমুক্ত বিএনপি আসনটিতে খোরশেদ আলমকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান। কিন্তু বিএনপির এ চাওয়ায় বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে রেদোয়ান আহমেদ। তিনি বিএনপি ও জাতীয়পার্টির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থেকে এ আসন থেকে চারবার এমপি নির্বাচিত হন। এরমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন তিনি। ২০০৬ সালে কর্নেল অলি আহমেদসহ বেশ কজন নেতা নিয়ে রেদোয়ান বিএনপি ছেড়ে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-এলডিপি নামে নতুন দল গঠন করেন। ওইসময়ে নেতৃত্বশূন্য চান্দিনা বিএনপির হাল ধরেন খোরশেদ আলম। এসময়ে একই দল করা রেদোয়ান ও খোরশেদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে তা হামলা-মামলায় রূপ নেয়।
চান্দিনায় বিএনপি নাকি এলডিপির অবস্থান থাকবে এ নিয়ে এখনো স্নায়ুযুদ্ধ চলছে দুই নেতার মধ্যে। যদিও ২০১২ সালে এলডিপি বিএনপি জোটের শরীকদলে পরিণত হয়েছে। ফলে এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপি জোটের প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে ইতোমধ্যে মাঠ গোছাতে শুরু করেছেন। এলডিপি চান্দিনার নেতাকর্মীরা জানান, ‘দল বদলালেও চান্দিনায় দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বদৌলতে রেদোয়ান আহমেদ এলাকায় প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তিনি জোটপ্রার্থী হলে এলডিপি ও বিএনপির শক্তির কাছে অন্য কোনো শক্তিই দাঁড়াতে পারবে না।’ বিএনপি ও এলডিপির এ মনোনয়নযুদ্ধে আগামী সংসদ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত চান্দিনা আসনে দলীয় নাকি জোটপ্রার্থী দেয়া হবে তা নিয়ে আলোচনায়মুখর চান্দিনাবাসী।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।