Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

সত্যালোকের সন্ধানে : মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কবর দেশে জীবিত আছেন

প্রকাশের সময় : ১৭ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এ, কে, এম, ফজলুর রহমান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
প্রকৃতপক্ষে এসব পবিত্র ব্যক্তিসত্তা নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে আঞ্জাম দেয়ার জন্য প্রত্যেক কওমেই জন্মগ্রহণ করেছেন। যারা তাদেরকে মান্য করেছে তারা নাজাত লাভ করেছে এবং যারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তারা হালাক ও বরবাদ হয়ে গেছে। কোরআনুল কারীমে তাদের জীবনেতিহাস, তাদের কর্মপদ্ধতি, তাদের উন্নত চরিত্রের উদাহরণ, তাদের একনিষ্ঠ আল্লাহপ্রীতি ও একাগ্রতাকে এমনভাবে বয়ান করা হয়েছে যে, তাদের এসব কাহিনী পাঠ ও শ্রবণ করলে তাদের প্রতি আনুগত্য ও আকর্ষণের মাত্রা ক্রমশই বেড়ে যায় এবং তাদের সততা ও সত্যবাদিতার ওপর সুদৃঢ় মনোবল গঠিত হয়। একই সঙ্গে তাদের নবুওতের মর্যাদার পরিপন্থী যেসব কথা ও কাহিনী তাদের প্রতি আরোপ করা হয়েছিল, ইসলাম সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং এগুলোর ভিত্তিহীনতার প্রমাণ উপস্থাপন করেছে।
মোটকথা, নবুওত ও রিসালতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ইসলাম তুলে ধরে ঘোষণা করেছে, নবী এবং রাসূলগণ গুনাহ থেকে পবিত্র এবং নিকৃষ্ট ও কদর্য আচার-আচরণ হতে তারা ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। বনী ই¯্রাঈলের কাছে নবুয়ত এবং রিসালতের এহেন সমুন্নত মর্যাদার চিন্তা ও কল্পনার লেশমাত্র ছিল না। এ জন্যই তারা অত্যন্ত নির্ভীকরূপে পয়গাম্বরদের প্রতি ইলজাম আরোপ করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। খ্রিস্টানরা একমাত্র ঈসা (আ.)-কে নিষ্পাপ মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে অন্যান্য সবাই পাপী ও অপরাধী। কিন্তু ইসলাম দুনিয়ার সব পয়গাম্বর এবং রাসূলের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একই পরিম-ল কায়েম করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্রতা এবং নিষ্কলুষতা সব আম্বিয়া ও রাসূলের সম্মিলিত গুণ। কেননা এক গোনাহগার অপর গোনাহগারের পথপ্রদর্শনের উপযুক্ত হতে পারে না, যেমন এক অন্ধ অপর অন্ধকে পথ দেখাতে পারে না। এই নিরিখে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অহি তাঁর শিক্ষা আল্লাহপাকের সব নিষ্পাপ রাসূলদের শ্রেষ্ঠত্ব ও বুজুুর্গী পৃথিবীতে কায়েম করেছে এবং যেসব প্রচ্ছন্ন বিরুদ্ধাবাদীর দল তাদের পবিত্রতা ও নিষ্কলুষতার পর্দায় নিজেদের অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে মালিন্য ও আবিলতা আরোপ করেছিল, সেগুলোকে ধুয়ে-মুছে-পাক-সাফ করেছে। আর এটাই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহৎ কর্মকা-ের একটি বিরাট দিক।
খোদ ইঞ্জিলের (যদিও তা আসল ইঞ্জিল নয়) ভাষ্যে সুস্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, হযরত ঈসা (আ.) দশটি আহকামের বাইরে নিজের মাতার প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করতে পারতেন না। এই ভুল ও ভ্রান্তিকর নির্দেশের মূলোৎপাটন করেছে আল কোরআন এবং হযরত ঈসা (আ.)-এর জবান হতেই ঘোষিত হয়েছে : “আমি হলাম স্বীয় মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারকারী এবং আল্লাহপাক আমাকে অত্যাচারী কঠোর চরিত্রের অধিকারী করে সৃষ্টি করেননি।” (সূরা মরিয়ম : রুকু-২)
অথচ দশটি আহকামের মাঝে মাতা-পিতার প্রতি শিষ্টাচার প্রদর্শন না করা ছিল দুর্ভাগ্যের বিষয়। তাছাড়া প্রচলিত ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আ.)-এর ওপর এই অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল যে, তিনি নামাজ-রোজার প্রতি ছিলেন বেপরোয়া। অথচ এ সম্পর্কে কোরআনের ভাষ্য হলো : “হযরত ঈসা (আ.) বলেন, আল্লাহপাক আমাকে নামাজ এবং যাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি জীবিত থাকব।” (সূরা মরিয়ম : রুকু-২)
ইহুদিরা হযরত মরিয়ম (আ.)-এর ওপর অভিযোগ উত্থাপন করেছিল। কিন্তু কোরআনুল কারীম তাদের এই অভিযোগ খ-ন করেছে, তা দূর করে দিয়েছেন এবং এই ঘোষণা জারি করেছে : “এবং মরিয়ম বিনতে ইমরান যিনি স্বীয় পবিত্রতাকে হেফাজত করেছিলেন, সুতরাং আমি তার মাঝে প্রাণ ফুঁকে দিলাম এবং তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নির্দেশসমূহ এবং তাঁর কিতাবসমূহকে সত্য বলে মেনে নিয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন বন্দেগীকারীদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা মরিয়ম : রুকু-২) কূট ষড়যন্ত্রকারী ইহুদিরা হযরত সুলায়মান (আ.)-কে তাবীজ-তুমার এবং আমালিয়াতের আবিষ্কর্তা বলে মনে করত। অথচ ছেহের এবং জাদুটোনা তৌরিতের দৃষ্টিতে ছিল শিরকের শামিল। কোরআনুল কারীম খোলাখুলি ইহুদিদের এই ইলজামের খ-ন করেছে। ইরশাদ হচ্ছে : “এবং সুলায়মান (আ.) কুফুরিসুলভ কোনো কাজ করেননি; কিন্তু শয়তানই কুফুরি কাজ করেছে এবং সে মানুষকে জাদু শিক্ষা দিয়েছে।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-১৩) অনুরূপভাবে ইহুদিরা হযরত লুত (আ.)-এর ওপর অপকর্মের ইলজাম দিয়েছিল। অথচ কোরআনুল কারীম এগুলোর অসারতা প্রতিপন্ন করেছে এবং সার্বিকভাবে এগুলোকে ভিত্তিহীন মিথ্যা বলে সাব্যস্ত করেছে।
উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, কোরআনুল কারীম অথবা রাসূলুল্লাহ (আ.) দুনিয়ার সব পয়গাম্বরের নাম উল্লেখ করেননি। শুধু নামের তালিকা অথবা নামের পরিচিতি বা ব্যক্তি পরিচিতির দ্বারা মানুষের অন্তরে আকর্ষণ এবং উদ্দীপনার উদ্রেক হয় না; এমনকি বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব প্রতিফলিত হয় না। তবু জানা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আহ্বান ধ্বনি একদিন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে এবং বহু ভিন্নধর্মী অন্য আম্বিয়াদের আস্তানাসমূহ এই পয়গাম্বরের হালকায় প্রবেশ করবে এবং নিজেদের আম্বিয়াদের নাম ও পরিচিতি সাহিফায় মোহাম্মদি (সা.)-এর মাঝে তালাশ করবে। এ জন্য একটি বিশেষ আয়াতে সব আম্বিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের সত্যতার পরিচিতিও তুলে ধরা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : “অবশ্যই আমি আপনার নিকট অহি প্রেরণ করেছি, যেমন হযরত নূহ (আ.) ও তাঁর পরবর্তী নবীগণের নিকট অহি প্রেরণ করেছিলাম, হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত ইসহাক (আ.), হযরত ইয়াকুব (আ.) ও তাঁর বংশধরগণ, হযরত ঈসা (আ.), হযরত আইয়ুব (আ.), হযরত ইউনুস (আ.), হযরত হারুন (আ.) এবং হযরত সোলায়মান (আ.)-এর নিকট অহি প্রেরণ করে ছিলাম এবং হযরত দাউদ (আ.)-কে যাবুর দিয়েছিলাম। অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি যাদের কথা পূর্বে আপনাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল যাদের কথা আপনাকে বলিনি এবং হযরত মূসা (আ.)-এর সঙ্গে আল্লাহপাক সাক্ষাৎ কথাবার্তা বলেছিলেন। সুসংবাদবাহী ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূল আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” (সূরা নিসা : রুকু-২৩) আম্বিয়াদের সম্পর্কে এই হাকীকতটি সূরা মু’মিনেও দ্বিতীয়বার বয়ান করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : “এবং অবশ্যই আমি আপনার পূর্বে বহু রাসূল প্রেরণ করেছি, যাদের কিছু সংখ্যকের কথা আমি আপনার কাছে বিবৃত করেছি এবং কিছু সংখ্যকের কথা বিবৃত করিনি।” (সূরা মু’মিন : রুকু-৪)
তা’লীমেম মোহাম্মদী (সা.)-এর বিধান মোতাবেক এই বিশ্বাস করাও জরুরি যে, দুনিয়ার বড় বড় কাওম এবং দেশÑ যেমন-চীন, ইরান, হিন্দুস্থানেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্বে আল্লাহর প্রেরিত নবীগণের আগমন ঘটেছিল। আর এ জন্য এসব অঞ্চলের অধিবাসীরা যেসব বুজুর্গের ইজ্জত ও সম্মান করে এবং নিজেদের দ্বীন ও মাজহাবকে যাদের দিকে সম্পৃক্ত করে, তাদের সততা, সত্যবাদিতার সার্বিক অঙ্গীকার কোনো মুসলমানই করতে পারে না। এই নিরিখে কোনো কোনো বিদ্বজ্জন হিন্দুস্থানের কৃষ্ণ- এবং রামকে এবং ইরানের জরদস্তকে, এমনকি কেউ কেউ বুদ্ধকেও পয়গাম্বর বলে অভিমত প্রকাশ করেছে। মোটকথা, তাদের কিংবা অন্য কারও নবী হওয়ার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে সন্দেহ করা যায় না। কিন্তু প্রকৃতই তারা নবী ছিলেন কিনা, তা নিরূপণ করার মানদ- আল কোরআনেই সুস্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে। তবে এদেরকে একিনসহ নবী হিসেবে নির্দিষ্ট করা সীমা লঙ্খন ছাড়া কিছুই নয়। এর সার্বিক আলোচনা নি¤েœ পেশ করা হলো। কুরআনুল কারীমে আম্বিয়াদের দুটি পরিচয় সূত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, আম্বিয়াদের নাম এবং কর্মকা- সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যাদের নাম কুরআনুল কারীমে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি এক্ষেত্রে সঠিক সিন্ধান্ত হলো এই যে, যে সকল আম্বিয়ার নাম কুরআনুল কারীমে সারাসরি উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের ওপর নাম বনাম বিশ্বাস স্থাপন করা সকল মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু যাদের নাম সরাসরি উল্লেখ নেই, তাদের সম্পর্কে শুধুমাত্র এতটুকু ইজমালী বিশ্বাসই যথেষ্ট যে, ঐ সকল জাতির বা কওমের কাছেও প্রেরিত পুরুষ নবী এবং রাসূল আগমন করেছিলেন। যদিও তাদের নাম জানা নেই।
কিন্তু যে সকল কাওম বা জাতি সেই অনুল্লিখিত নবীদের নবী হিসেবে নাম স্মরণ করে, এ সম্পর্কে ইসলাম দিক দর্শনের দুটি পথ রয়েছে। প্রথমত, অনুল্লিখিত যে সকল ব্যক্তিসত্তাকে নবী বলে মনে করা হচ্ছে যদি তাদের জীবন এবং শিক্ষা নবুওত এবং রিসালাতের মর্যাদার অনুকূল হয়, তাহলে তাদের নবুওত এবং রিসারাতের দিকে জোরারো কারণ পাওয়া যাবে। কিন্তু তাদেরকে নবী হিসেবে চূড়ান্ত বিশ্বাসের আওতাভুক্ত করা যাবে না। কারণ, নবী ও রাসূলকে বিশ্বাস করার মূল মানদ- হচ্ছে অহি যেহেতু অহি তাদের সম্পর্কে নীরব ভূমিকা পালন করেছে, সেহেতু সুনির্দিষ্ট পন্থা বা মতাদর্শ গ্রহণ করা মোটেই ঠিক হবে না।
(কালেমাতে তাইয়্যিবাত ঃ হযরত শাহ মাজহার জান জানান মিলাল ওয়ান্নিহাল ঃ ইবনে হাজাম) এই শ্রেণীর আম্বিয়া তাদের নাম যদিও কুরআনুল কারীমে নেই কিন্তু তারা রাসূলূল্লাহ (সাঃ)-এর পূর্বে জীবনকাল অতিবাহিত করেছেন এবং তাদের অনুসারীগণ তাদেরকে নবুওত এবং রিসালাতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তাদের পরিচয় ও সনাক্তকরণের একটি নিয়ম-নীতি কুরআনুল কারীম নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাহল তারা নিজেদের কাওম এবং জাতিকে তাওহীদের শিক্ষা দিয়েছেন কি-না। যদি তারা তাওহীদের শিক্ষা প্রদান করে থাকেন তাহলে তাদেরকে নবুওত ও রিসালাতের মর্যাদায় সমাসীন বলে মনে করা যাবে। আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে : “এবং আমি প্রত্যেক কাওমের মাঝে রাসূল প্রেরণ করেছি যেন এই শিক্ষা প্রচার করে যে, তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং মিথ্যা উপাস্যদের খপ্পর হতে বেঁচে থাক।” (সূরা নাহল : রুকু-৫) অপর এক আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে : “এবং আমি আপনার পূর্বে এমন কোন নবীকে প্রেরণ করিনি যারা এই শিক্ষা প্রদান করে নাই যে, আল্লাহ ছাড়া কোনই উপাস্য নাই সুতরাং তোমরা আল্লাহপাকেরই ইবাদত কর।” (সূরা আম্বিয়া : রুকু-২)
এসকল কারণে পূর্ববর্তী মানব সংস্কারকগণকে এবং পৃথিবীর পথ-প্রদর্শকগণকে যারা পৃথিবীবাসীদের সামনে তাওহীদের শিক্ষাকে সমুন্নত করেছেন এবং মূর্তিপূজা ও অংশীবাদিতার ছোঁয়াচ হতে মানুষকে বেঁচে থাকার পরামর্শ প্রদান করেছন তাদের সম্পর্কে নিশ্চিতরূপে এ কথা বলা যাবে না যে, তারা নবী কিংবা রাসূল ছিলেন না। কেননা কুরআনুল কারীমের বিধান মোতাবেক পৃথিবীর এত বড় বড় জনসমষ্টি ষোল আনাভাবে নবী এবং রাসূল থেকে বঞ্চিত থাকবে এমনটি কল্পনা করা যায় না। কেননা কুরআনুল কারীমের স্বীকৃত ও সমর্থিত শিক্ষাকে গ্রহণ না কের কোন মানুষই মুসলমান পদবাচ্যের যোগ্য হতে পারে না। কিন্তু এর জন্য তাওহীদের শিক্ষা পাওয়া প্রধান শর্ত। যেখানে এ শিক্ষার অভাব সেখানে রিসালাত ও নবুওতের মর্যাদাকে আরোপ করা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। তবে হ্যাঁ, কুরআনুল কারীমে হয়তো কোন নবী এবং রাসূলের নাম উল্লেখ নেই অথচ তারা যে তাওহীদের শিক্ষা প্রদান করেছিলেন তা প্রামাণ্য সূত্রে সমর্থিত, তাহলে তাদের নবুওত ও রিসালাতকে সমর্থন করা যেতে পারে। কুরআনুল কারীমের দিক নির্দেশনা মোতাবেক এটাও সুস্পষ্ট যে নবী এবং রাসূলগণের মর্যাদা ও কর্মকা-ের ব্যাপ্তি একই সমান ছিল না। কোন কোন ক্ষেত্রে কেউ হয়তো অধিক মর্যদার অধিকারী; কিন্তু সমাগ্রিকভাবে নয়। এই দিকনির্দেশনা কুরআনুল কারীমে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : “এই রাসূলগণের মাঝে আমি কাউকে অন্য কারো ওপর অধিক ফজিলত প্রদান করেছি এবং তাদের কারো সাথে আল্লাহপাক বাক্যালাপ করেছেন এবং কাউকে বেশি মর্যদা প্রদান করেছেন এবং আমি ঈসা ইবনে মরিয়মকে নির্দশনাবলি প্রদান করেছি এবং পবিত্রতা দ্বারা তাকে সহায়তা দান করেছি।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-৩৩)
রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্যান্য নবী রাসূলগণের সম্মান এবং ইজ্জতকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে এতই সচেতনতা অবলম্বন করেছিলেন যে, কখনো কখনো তিনি নিজের কথাও বিস্মৃত হয়ে যেতেন। একবার জনৈক সাহাবী তাঁকে ইয়া খাইরাল বারিয়্যাহ অর্থাৎ হে সর্বোত্তম সৃষ্টি বলে সম্বোধন করল। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, “তিনি ছিলেন হযরত ইব্রাহীম (আ.)” (মুসনাদে ইবনে হাম্বল : ১ম খ. ১২৪ পৃ.)
আর একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! কোন নবী সবচেয়ে উঁচু খান্দানের ছিলেন? তিনি উত্তর করলেন, “হযরত ইউসুফ পয়গাম্বর ইবনে পয়গাম্বর ইবনে পয়গাম্বর ইবনে পয়গাম্বর খালিলুল্লাহ।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল আম্বিয়া : মানাকেবে হযরত ইউসুফ, পৃ. ৪৭৯)
একবার একজন ইহুদি মদিনার রাস্তায় এ কথা বলে বেড়াচ্ছিল যে, “ঐ আল্লাহর শপথ, যিনি হযরত মূসা (আ.)- কে সকল মানুষের উপর মর্যাদা প্রদান করেছেন।” একজন মুসলমান তার এ কথা দাঁড়িয়ে শুনছিলেন এবং তিনি মনে করলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বর্তমানে এ লোকটি এ-কি কথা বলছে? রাগে, গোসায় উত্তেজিত হয়ে তিনি ইহুদি লোকটিকে ভীষণভাবে প্রহার করলেন। ইহুদি দরবারে নববীতে উপস্থিত হয়ে এই অভিযোগ পেশ করল। রাসূলুল্লাহ (সা.) অভিযুক্ত সাহাবীকে দরবারে তলব করলেন এবং ঘটনার বিবরণ শুনলেন। এতে তিনি খুবই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, “তোমরা পয়গম্বারদের মাঝে পরস্পরকে পরস্পরের উপর এমন মর্যাদা প্রদান কর না যাতে কারও পদমর্যাদার অবমূল্যায়ন ঘটে।” (সহীহ বুখারী : মানাকেবে হযরত মূসা (আ.), ৪৮৯ পৃ.)
এগুলোই হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহতী শিক্ষা। যার বদৌলতে বিশ্বময় একই ধর্মাদর্শ, রূহানী সমতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও সকল নবী রাসূলের সম্মান ও মর্যাদার অনুপ্রেরণা পয়দা হয়েছে। বনী ইস্রাঈলের নবীগণের অনুসারীদের সংখ্যা সারা বিশ্ব জুড়ে কয়েক লাখের বেশি ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা.) যে পরিপূর্ণ ইসলামের সাংবিধানিক ও ব্যবহারিক জীবন-দর্শন বিশ্বময় প্রতিষ্ঠা করে গেছেন এই সত্য মতাদর্শের অনুসারীদের সংখ্যা বর্তমান বিশ্বে ১৭০ কোটিরও অধিক হয়ে গেছে। একই সাথে হযরত মরিয়ম (আ.) এবং হযরত ঈসা (আ.)-কে ইহুদিরা দীর্ঘ ছয়শত বছর ধরে যে সকল অপবাদ প্রদান করেছিল, রাসূলুল্লাহ (সা.) আগমন করেই তাদের অপবাদকে খ-ন করেন এবং তাদেরকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে তাদের সচ্চরিত্রতা ও পবিত্রতার সাক্ষ্য প্রদান করেন। যার বদৌলতে বর্তমান বিশ্বে হাজার হাজার ভাষাভাষী লোক তাদের পবিত্রতার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। প্রকারান্তেরে হিন্দুস্থান, ইরান, চীন এবং অন্যান্য দেশে সত্যধর্ম প্রচারকদের পরিচয় এবং তাদের কর্মকা- সম্পর্কে বহির্বিশ্ব মোটেই অবহিত ছিল না এবং এ সকল ধর্মবেত্তাদের সম্মান ও মর্যাদার আসনও বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। কিন্তু মুসলমানগণ যেখানেই গমন করেছেন সেখানেই সত্যিকার নবী ও রাসূলদের সম্মান ও মর্যাদাকে বহন করে নিয়ে গেছেন।
যে আরবের অধিবাসীরা পয়গাম্বরদের নাম পর্যন্ত জানত না, যারা নবুওত ও রিসালতের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবহিত ছিল না, যারা নবী ও রাসূলগণের নৈতিক অবস্থার সাথে পরিচিত ছিল না, যারা নবীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং সত্যতা, বিশ্বাস স্থাপন করতে পারত না এবং যারা নিজেদের দেবতা ও উপাস্যদের বিপরীতে হযরত ঈসা বিন মরিয়মের কাজ ও কথাকে হাস্যকর বলে মনে করত এবং যারা হযরত মূসা (আ.)-এর মর্যাদা ও ফজিলতের কথা শুনে নিজেদের গোসা সংবরণ করতে পারত না। এ শ্রেণীর আরবরাই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র শিক্ষা ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এমন এক পর্যায়ে উপনীত হল যে, কয়েক বছরের মাঝেই তারা এক একজন পয়গাম্বরের নাম, পরিচয় এবং জীবনেতিহাস সম্পর্কে অবগত হল।
এমনকি নিজেদের সন্তান-সন্তুতির নাম নবী ও রাসূলগণের নামের সাথে সম্পৃক্ত করে বরকত ও রহমত হাসিল করতে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠে। এতে করেই ইসলাম বিস্তৃতির সাথে সাথে নবী ও রাসূলগণের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পরিধি বিশ্বজোড়া বিস্তৃত হয়ে উঠে। এই মুসলমানরাই নবী ও রাসূলগণের সততা ও সত্যবাদিতার সাক্ষ্যের ঝা-া সমুন্নত করেছেন এবং পয়গাম্বরদের সম্মান ও মর্যাদাকে নিজেদের অন্তরের মণিকোঠায় স্থান দান করেছেন। এমনকি তাদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা, উদ্দীপনাকে দ্বীন ও ঈমানের প্রকৃষ্ট পরিচিতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নিতান্ত দুঃখের কথা হল এই যে, নবী ও রাসূলগণের এই মর্যাদা ও সম্মানের যথাযথ স্বীকৃতি দুনিয়ার অন্য কোনও জাতির কর্মকা-ের পরিদৃষ্ট হয় না। একমাত্র ইসলামই পয়গাম্বরদের নামকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে শিখিয়েছে এবং প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব এবং কর্তব্যকে এভাবে তুলে ধরেছে যে, পয়গাম্বরদের নাম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হবে এবং তাদের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করতে হবে। (অসমাপ্ত)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন