Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭, ২৪ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

দৃষ্টি সবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে

প্রকাশের সময় : ১৭ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম | আপডেট : ১১:৩৩ পিএম, ১৬ মার্চ, ২০১৬

অর্থনৈতিক রিপোর্টার : দৃষ্টি সবার রাষ্ট্রীয় কোষাগার হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকে। বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির গতি-প্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেয় সেটা জানার জন্য সবাই উদগ্রীব। ব্যাংকিং নিয়ম না মানায় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) শাখা ব্যবস্থাপক মায়া সাস্তোস দেগুইতোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির পরও গভর্নর ড. আতিউর রহমান পদত্যাগ করে মাথা উঁচু করে ‘বীরের বেশে’ চলে গেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিদ্রোহী কবির মতো ‘বল বীর/ বল উন্নত মম শির’ দম্ভোক্তি করেছেন। তার দাবি তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। অথচ গতকাল অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থা খুব খারাপ। নতুন গভর্নর যোগদানের পর প্রতিষ্ঠানটির খোল-নলচে পাল্টে ফেলতে হবে।
গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগ, দুই ডেপুটি গভর্নরের অব্যাহতি, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে ওএসডি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আরও পরিবর্তন আসছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। বিশেষ করে দুইজন নির্বাহী পরিচালক ও দুইজন মহাব্যবস্থাপক পদে অচিরেই পরিবর্তন আনা হবে। অর্থমন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা ভালো নয়, নাজুক। সেখানে উপযুক্ত পরিবেশ নেই। তাই এর পুনর্গঠন জরুরি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞ ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্তানার কাজের পরিধি কমানোরও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। কারণ ইতোমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে একজন বিদেশীর ওপর কীভাবে নির্ভরশীল হওয়া যায়? টাকা চুরির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরাপত্তা বাড়াতে সব পিসিতে তার সরবরাহকৃত সফটওয়্যার সংযোজন করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তারা নিরাপত্তার পরিবর্তে দেশের আর্থিক খাত নতুন করে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দেশে যোগ্য ব্যক্তি থাকার পরও কেন তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা নিয়েও বিতর্ক হচ্ছে। তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশ ইতোমধ্যেই ব্যাংকের ডিলিং রুম ও আইটি বিভাগের ৪ কর্মকর্তাকে আটক করেছে। এ ঘটনায় সদ্য পদত্যাগ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান এবং অপসারিত দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবে সিআইডি বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে আতিউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ায় তাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়েছে।
সূত্রমতে, গভর্নর ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগ, দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানার অব্যাহতি, অর্থমন্ত্রীর আরও পরিবর্তন আসতে পারে, এই হুঁশিয়ারি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে সিআইডি কর্মকর্তারা তদন্তে আসায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কর্মকর্তারা কেউই কোনো বিষয়ে কারো কাছে কিছু বলছেন না। শুধু বলেন, দেখেন কী হয়। অধিকাংশ কর্মকর্তাই রুমে বসেই অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বত্র কার্যত ভীতিকর পরিস্থিতি।
গতকাল সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনর্গঠন জরুরি ছিল। নতুন গভর্নর ১৮ মার্চ দেশে ফিরে ১৯/২০ মার্চে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তিনি দায়িত্ব বুঝে নিলেই ব্যাংকের সমস্যা সমাধানে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেয়ার পরই বাংলাদেশ ব্যাংকের সবকিছু দেখাশোনা করবেন। নতুন দুই ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করে বিষয়টি তিনিই দেখভাল করবেন। এজন্য এটি একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে
ওএসডি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার সঙ্গে সচিব জড়িত নন। কিন্তু তিনি ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ছিলেন, বিষয়টা তার জানা উচিত ছিল। জানেন না বলে নিজের দায় এড়াতে পারেন না তিনি। এ কারণে তাকে সরানো হয়েছে। মন্ত্রী আরো বলেন, রিজার্ভ চুরির বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে, সে বিষয়টিও নতুন গভর্নরই দেখবেন। এছাড়া রিজার্ভ চুরির বিষয়ে যে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে এর প্রতিবেদন বিষয়টিও তিনিই দেখবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞ ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্তানার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এটাও নতুন গভর্নরই দেখবেন। তবে তার কাজের পরিধি কমানো হবে।
মন্ত্রী জানান, নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেয়ার পর সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ দেয়া হবে। এতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক পরিদর্শন করেছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দফতরে বেশ কিছু সময় অবস্থানের পর কিছু তথ্য নিয়ে তারা চলে যান। তবে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হানুল করিমকে বাংলাদেশ ব্যাংকের করা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
গত মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করার পর জানানো হয় এর তদন্ত করবে সিআইডি। গতকাল সিআইডির অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক শাহ আলমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকে এ বৈঠক করছে।
সিআইডির কর্মকর্তারা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টাকা চুরির বিভিন্ন তথ্য নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এর আগে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরির ঘটনা জানাজানির এক সপ্তাহ পরে গত মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। যদিও মামলার বাদী জোবায়ের বিন হুদাকেও গ্রেফতার করা হতে পারে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিলিং শাখার প্রধান যুগ্ম পরিচালক (জেডি)। অর্থ চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ২-১ দিনের মধ্যেই প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে আটক করা হবে বলে তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে। কারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির ঘটনায় সন্দেহের বাইরে তিনি নন বলে অভিমত ব্যক্ত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক অব দ্য ডিলিং রুম শাখায় এ ঘটনার সূত্রপাত। তাই ডিলিং রুমের প্রধানসহ আরো বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পাশাপাশি আইটি ও প্রযুক্তি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কয়েকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮ কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখার কথাও ইতোমধ্যে শোনা গেছে। ব্যাংকের অসমর্থিত একটি সূত্র দাবি করেছে, গত মঙ্গলবার মতিঝিল এলাকা থেকে ডিলিং রুম ও আইটি বিভাগের ৪ কর্মকর্তাকে আটক করেছে পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে সিআইডির দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকেও গতকাল তাদের কাজ করতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি বলেও জানা যায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মারুফ হোসেন সরদার বলেন, মামলার এজাহারে ব্যাংক চুরির ঘটনাটি সিআইডি তদন্ত করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক কিংবা গ্রেফতার করেনি।
তদন্ত সূত্র জানায়, এত বড় একটি ঘটনা জানাজানিতে কেন বিলম্ব করা হয়েছে বিষয়টি জানতে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কয়েক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সিআইডির পাশাপাশি ঘটনাটির ছায়াতদন্ত করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটি)।
এছাড়া রিজার্ভ থেকে টাকা জালিয়াতির ঘটনায় মঙ্গলবার সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আরো দুজন অর্থনীতিবিদকে সদস্য রাখা হয়েছে। এই কমিটি তদন্ত শেষে প্রতিবেদন আকারে বিস্তারিত তুলে ধরবে।
এদিকে পদত্যাগী গভর্নর ড. আতিউর রহমানের মন্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ রাশেদ আহমেদ তীতুমীর বলেছেন, আতিউর রহমান যে দাবি করেছেন তিনি রিজার্ভ রেকর্ড গড়েছেন, এসব সঠিক নয়। ওই টাকা বিদেশে কর্মরতরা পাঠিয়েছে। সেই ঘামঝরা টাকা তিনি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। গবেষক আফসান চৌধুরী বলেছেন, এত বড় চুরির ঘটনা যার দায়িত্বে থাকার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে ঘটেছে, তার এভাবে কথা বলা উচিত হয়নি। তিনি দায় এড়াতে পারেন না। অন্যদেশ হলে তাকে এতক্ষণে বিচারের মুখোমুখি করা হতো। ফিলিপাইনে সেটা শুরু হয়েছে। অথচ তিনি আমাদের বোকা ভাবছেন।
উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা থেকে ৮শ কোটি টাকা হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও ফিলিপাইনের একটি সংবাদ মাধ্যম তা ফাঁস করে দেয়। মূলত ফিলিপাইনের কয়েকটি ক্যাসিনোর মাধ্যমে এ টাকা পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, চুরি যাওয়া অর্থের কিছু উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ফিলিপাইনের অর্থ পাচারবিরোধী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে বাকি অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।



 

Show all comments
  • তানবীর ১৭ মার্চ, ২০১৬, ১:০৯ পিএম says : 0
    দেশ থেকে আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • বিপ্লব ১৭ মার্চ, ২০১৬, ১:১৫ পিএম says : 0
    বাংলাদেশ ব্যাংক কেন বিষয়টি গোপন রেখেছিলো, তা উত্তর চাই।
    Total Reply(0) Reply
  • সুমাইয়া ১৭ মার্চ, ২০১৬, ১:১৬ পিএম says : 0
    এই টাকা অবশ্যই ফের আনতে হবে।
    Total Reply(1) Reply
    • সিফাত ১৭ মার্চ, ২০১৬, ১:১৮ পিএম says : 4
      যারা এর সাথে জড়িত, তাদেরও শাস্তি চাই।

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দৃষ্টি সবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ