Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

গতানুগতিক মোড়কে কৃষি

সম্প্রসারণ, মৃত্তিকা, শিক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে নেই কোন সমন্বয়

মিজানুর রহমান তোতা | প্রকাশের সময় : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

অনেকটাই ঢিলেঢালাভাবে চলছে কৃষি। কৃষি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং কর্মবীর কৃষকদের স্বার্থে দেশে মৃত্তিকা সম্পদ ইন্সটিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ, বীজবর্ধন খামার, কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, হটিকালচার এবং বিএডিসিসহ অসংখ্য বিভাগ রয়েছে। এতগুলোর বিভাগ থাকা সত্বেও কৃষি খুব বেশী এগুচ্ছে না। বিভাগগুলোর উদ্দেশ্য স্বল্প জমিতে আধুনিক প্রযুক্তিতে বেশী আবাদ ও উৎপাদন করে বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপও অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী। কিন্তু উদ্যোগ ও নির্দেশনা সকলক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না যথাযথভাবে। এর অন্যতম কারণ কৃষির বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। তাছাড়া রয়েছে একশ্রেণীর কৃষি কর্মকর্তার উদাসীনতা, দলবাজি, দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থা। মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তা বলেছেন, সমস্যাটা হচ্ছে গতানুগতিক মোড়কে আটকে পড়ে আছে কৃষি। যার জন্য যতটা এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ছিল, ততটা এগুতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সুত্র জানায়, গবেষণাগারে নিত্যনতুন জাত, প্রযুক্তি ও কলাকৌশল আবিস্কার হয় ঠিকই। অথচ ফল যায় না মাঠে। বড়জোর প্রদর্শনী প্লটে, কৃষকের দোরগোড়ায় নয়। প্রকৃতপক্ষে মাঠে নেই গবেষণার ফল। এতে মার খাচ্ছে আবাদ ও উৎপাদন। অভিযোগ কৃষি কর্মকর্তারা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেন না। যশোরের শার্শা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নের শালকোনা গ্রামের কৃষক বাবুল আকতার, মোঃ আলম ও হাবিবুর রহমান ডাবলুসহ অনেক কৃষকের অভিযোগ মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে নেমে সমস্যার সমাধান এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার ফল পৌছে দিলে কৃষক আরো এগিয়ে যেতেন। উন্নয়ন ঘটতো সামগ্রিক কৃষির। কৃষকের কথা, সরকার তো কমবেশী আমাদের জন্য ভালো ভালো উদ্যোগ নেয়, কখন কি ফসল উৎপাদন হবে, কিভাবে হবে, কোন জমিতে কোন ফসল উপযোগী-এসব জ্ঞান দেওয়ার জন্য কৃষি শিক্ষার ব্যবস্থা করে, কৃষি গবেষণার ফল মাঠে পৌছানোর নির্দেশ দেয়, অনেকস্থানে কৃষি তথ্যকেন্দ্রও স্থাপন করেছে, কিন্তু এর সুফল কৃষকরা পান না।
যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, কুিষ্টয়া ও নড়াইলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ কৃষকের অভিযোগ, সরকার কৃষির উন্নয়নে ও কৃষকের স্বার্থে যেসব কর্মসূচী নিয়ে থাকে তার যথাযথ কৃষকের দোরগোড়ায় পৌছানোর বিষয়টি বরাবরই অনুপস্থিত থাকছে। কৃষকের নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে গতানুগতিক ধারায় বেশীরভাগ কৃষি আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে। কৃষকের ঘরে ঘরে সার, প্রযুক্তি নিয়মানুযায়ী পৌছাচ্ছে কিনা তা দেখার কেউ নেই। জেলা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের অব্যবস্থা অনিয়ম দুর্নীতি তদন্ত হয় না। ডিলাররা কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে মাসে মাসে সার উত্তোলন করেন। তারা বাফার স্টকের গেটেই কালোবাজারে বিক্রি করে নিজের পকেট ভারী করে। অথচ ইউনিয়নভিত্তিক সার ডিলারদের প্রত্যায়ন দিচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যশোর সদর উপজেলায় একশ্রেণীর সার ডিলারের দুর্নীতি ওপেনসিক্রেট। এখানে প্রভাবশালী অনেক ডিলার আছেন যারা কখনোই সার কৃষকের কাছে বিক্রি করেন না। বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন দেখান। কালোবাজারে বিক্রি করে টাকা তোলেন পকেটে। গাফিলতি রয়েছে কৃষি গবেষণার। নিত্যনতুন পদ্ধতি ও কৃষি বিজ্ঞানীদের গবেষণার আধুনিক প্রযুক্তি মাঠে পৌছাচ্ছে না বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের কথা, কৃষি বিপ্লব ঘটানোর সরকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে কৃষি ও কৃষকের চেহারা আরো পাল্টে যেত।
কখন কি ফসল কোন জমিতে কিভাবে আবাদ করতে হবে, কোনটা লাভজনক, সারের মাত্রা কি হবে, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতেই বা কি ব্যবস্থা, মাঠের দাম আর বাজার দাম কি, কোন সময়ে ফসল বিক্রি করলে কৃষকরা লাভবান হবে-এসব তথ্যাদি জানার অভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পদে পদে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি তথ্য সার্ভিস সুত্র জানায়, যশোরসহ সারাদেশে ১০টি কৃষি অঞ্চলে কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে বেশ আগে। দাবি করা হয় অজস্র কৃষক এর সুবিধা পাচ্ছেন। কৃষি তথ্যকেন্দ্র সরকারের দেয়া কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্রের যাবতীয় সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে কৃষক ন্যুনতম সুবিধা পাচ্ছেন না। সুত্রমতে, সময়মতো রোগবালাই প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নেয়া, মাঠ কর্মকর্তারা মাঠে নেমে পরামর্শ না দেয়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং উপযুক্ত মূল্য না পাওয়ায় মার খেতে খেতে কৃষকের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে। একসময় কোন প্রযুক্তিই সাধারণত মাঠে যেত না। আবহমানকাল থেকে কৃষকরা চাষাবাদ করত গতানুগতিক ধারায়। তাতে কৃষিতে বিরাট উন্নয়ন না হলেও ক্ষতি ও লোকসানের মাত্রা ছিল অনেকটাই কম। এখন অনেক পরিবর্তন ঘটছে। পাল্টে যাচ্ছে চাষাবাদ পদ্ধতিও। এখন কৃষি গবেষণাগার থেকে প্রযুক্তি মাঠে যাবার বিধান রয়েছে। অতিমাত্রায় ব্যবহারও হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু আধুনিক পদ্ধতির নিয়ম কানুন যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় চোখের পলকে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় মাঝেমধ্যে। যা সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। ত্রাহি অবস্থা হয় ক্ষতি পুরণ করতে কৃষকের। সেজন্য সরকারের মাঠপর্যায়ের কমকর্তাদের দায়িত্বপালনে যত্মবান হওয়ার জরুরি নিদের্শনা দেওয়া দরকার বলে কৃষি বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

 

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ