Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭, ০৯ কার্তিক ১৪২৪, ০৩ সফর ১৪৩৯ হিজরী

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিকভাবে চরম ব্যর্থ বাংলাদেশ -সুজন

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৩ অক্টোবর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় জোনোসাইডের সব শর্ত পূরণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। সুজন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে চরম ব্যর্থ। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুজন আয়োজিত রোহিঙ্গা সমস্যা: প্রেক্ষিত, বর্তমান পরিস্থিতি আর সম্ভাব্য করণীয় শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জেনোসাইডের ১০টি শর্ত রয়েছে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় যার প্রতিটি পূরণ হচ্ছে। এটা বিশ্ব স¤প্রদায়ের সামনে চলমান হত্যাযজ্ঞ। গোলটেবিল বৈঠকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুজনের নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, এ সমস্যার আশু সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের বিভিন্ন ঘটনার কারণে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে যেতে পারে। বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় ১০ লাখ শরণার্থীর চাপ সহ্য করা দুরূহ হবে। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা ইস্যু ভয়াবহ নিরাপত্তাজনিত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এ বিরাট উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আবদ্ধ করে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। ফলে জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রচেষ্টায় স্থানীয়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, এমনকি দ্ব›েদ্বও জড়িয়ে পড়তে পারে। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো চরমভাবে নিগৃহীত ও ক্ষুব্ধ এ জনগোষ্ঠীকে স্বার্থান্বেষী মহল উগ্রবাদের পথে প্ররোচিত করতে পারে। যা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলকেই অস্থিতিশীল করতে পারে।
বৈঠকতে সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান, সুজন নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন ও সৈয়দ আবুল মকসুদ, আবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ, এম আনোয়ারুল হক, ড. সি আর আবরার, এএসএম আকরাম, রেহেনা সিদ্দীকী এবং সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সুজন নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার। লিখিত বক্তব্যে আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন নেত্রী অং সান সু চি বলেছিলেন, তার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে। কেন তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে তাও খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু তাঁর এ ভাষণের পরও এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বেশ আগে। বক্তব্যের সারবক্তা থাকলে অন্তত তিনি দেশত্যাগ দ্রæত বন্ধ করে একটি আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হতেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করবো, বিভিন্ন দেশের যত স্বার্থই মিয়ানমারের থাকুক তারা হতভাগ্য রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ ও তাদের দ্রæত ফিরিয়ে নেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে কার্যকরী প্রভাব রাখতে পারে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের মান্যবর রাষ্ট্রদূত যখন কক্সবাজার থেকে অন্য ক‚টনীতিকদের সাথে সফর করে এসে বলেন এদেশে আসা রোহিঙ্গাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাঁবু ও কম্বল, তখন আমরা সত্যিই ব্যথিত হই। প্রকৃতপক্ষে তাদের সর্বাগ্রে প্রয়োজন মিয়ানমারের নাগরিত্বের স্বীকৃতি ও স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের নিরাপদ ও সম্মানজনক ব্যবস্থা। মজুমদার বলেন, ‘এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না শেষ পর্যন্ত কত রোহিঙ্গা এদেশে আসবে। তাই তাদের নিবন্ধন, আশ্রয় শিবির নির্মাণ, ত্রাণ কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিকরণ, পয়ঃনিষ্কাশন, পানি সরবরাহ ও চিকিৎসা ইত্যাদি শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়, যে সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে যে, আমাদের জনবহুল দেশটি কি রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে নিয়ে নেবে? এরূপ ভাবনা একেবারেই অসঙ্গত। রোহিঙ্গাদের পক্ষে যে বিশ্ব জনমত তাকে কাজে লাগাতে আমাদের সক্রিয় ও বিরামহীন প্রচেষ্টা নিতে হবে। যারা মিয়ানমারকে এ নিধনযজ্ঞে সক্রিয় বা নীরবে সমর্থন করছে আমাদের প্রতিও তাদের দায়বদ্ধতা আছে। এটা কূটনৈতিক চ্যানেলে তুলে ধরতে হবে বারংবার। মিয়ানমার সরকারই গঠন করেছিল কফি আনান কমিশন। সে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য মজুমদার কতগুলো বিষয় তুলে ধরেন:
এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট জাতীয় জীবনে এক বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। ১৯৭৮ সালে থেকে এ সমস্যার শুরু। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে আমাদের দেশের সরকার এর ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্র। কিন্তু এই দেশটির সাথে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আজও তৈরি হলো না কেন তা আমাদের বোধগম্য নয়।’ তিনি আরো বলেন, আমরা এ সমস্যার সমাধান চাই। শরণার্থীদের তারা তাদের দেশে ফেরৎ নিয়ে যাক। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন যাবৎ বঞ্চিত, নিগৃহীত। এ সঙ্কটের আশু সমাধান প্রয়োজন। ৭১-এর পরে এ ধরনের জাতীয় দুর্যোগ আর আসেনি। এ সংকটের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব রয়েছে। ড. হামিদা হোসেন বলেন, আমাদের উচিৎ কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনটি নিয়ে কাজ শুরু করা। তিনি বলেন, সরকারকে বেসরকারী সংগঠন, সাধারণ জনগণ সকলকে নিয়ে এ সঙ্কট সমাধানে কাজ করতে হবে। আর তা না হলে এ সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করবে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, এ সঙ্কটের ২টি দিক রয়েছে, একটি দিক হলো এতো লোক আশ্রয়হীন হয়ে আমাদের দেশে এসে পড়েছে, তাদের দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। অপরদিকটি হলো এসকল মানুষকে তাদের দেশে ফেরৎ পাঠাতে হবে। তিনি বলেন, একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হয়েছে, যা অকল্পনীয় ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এ ব্যর্থতা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের। সমগ্র জাতি ও আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় এ সংকটের দিকে তাকিয়ে রয়েছে উল্লেখ করে ড. সি আর আবরার বলেন, ‘কিভাবে যে তারা দিনাতিপাত করছে তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। শিশুগুলো এতিমের মতো ঘুরে বেরাচ্ছে। গর্ভবতী নারীদের অবস্থাও শোচনীয়। তিনি বলেন, আমার মনে হয় রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভাজন করার দরকার নেই, তারা সকলেই শরণার্থী। শুধুমাত্র যারা শেষে এসেছে তাদের দিকে বিশেষ দৃষ্টি প্রদান জরুরি। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে অবশ্যই ফেরত পাঠাতে হবে এবং এ জন্য আমাদের চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনাবহিনী কর্তৃক রাখাইনে যে সহিংসতা ও সন্ত্রাস চালানো হয়েছে তা ভিন্ন মাত্রার। গণমাধ্যমের কারণে আজ এ ঘটনা সকলেই অবগত। এ ঘটনা হিচলারের নাৎসী বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। মিয়ানমার পূর্বপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিন চিন্তা করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

 


Show all comments
  • md billal ১৩ অক্টোবর, ২০১৭, ৬:৫৫ এএম says : 0
    আপনাদের খবর হল বাংলার সেরা খবর
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর