Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০১৯, ০৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৭ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

ট্যানারি বর্জ্য নিষ্কাশনে অব্যবস্থাপনা

| প্রকাশের সময় : ১৪ অক্টোবর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

এক নদী বাঁচাতে আরেক নদী ধ্বংস করা কোনো বিবেচনাপ্রসূত কাজ হতে পারে না। বুড়িগঙ্গাকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্প অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। সেখানের ধলেশ্বরী নদীতে সেই একই বিষাক্ত ট্যানারি বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এই নদীটি এখন বুড়িগঙ্গার মতোই দূষিত হচ্ছে। আশপাশের পরিবেশও বিষাক্ত হয়ে উঠছে। গতকাল বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাভারের চামড়াশিল্প নগরের ট্যানারিগুলোর তরল বর্জ্যের একটি অংশ সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে পড়ছে। চামড়া পরিশোধনের পর এই তরল বর্জ্য ট্যানারি থেকে মাটির নিচের পাইপলাইন দিয়ে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারে (সিইটিপি) যাওয়ার কথা থাকলেও তা পানি নিষ্কাশনের ড্রেন দিয়ে ধলেশ্বরীতে পড়ছে। এমনকি সিইটিপিতে পরিশোধন করে যে পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে, তাতেও ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে। অথচ ট্যানারির তরল বর্জ্য এমনভাবে পরিশোধন করে নদীতে ফেলার কথা, যাতে নদীর কোনো ক্ষতি না হয়। এই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য চীনের যে প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্বে রয়েছে, সে তার দয়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নদীতে অপরিশোধিত, আধাশোধিত বর্জ্য ফেলা, ট্যানারির বর্জ্য টেনে সিইটিপিতে না নেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কাজে ঢিলেমি ও নি¤œমানের যন্ত্রপাতি আমদানির অভিযোগও উঠেছে। বোঝা যাচ্ছে, সিইটিপিও পরিপূর্ণভাবে কাজ করছে না। অন্যদিকে উচ্চ আদালত সিইটিপি পুরোপুরি প্রস্তুত করতে চার সপ্তাহের নির্দেশ দিয়েছে। কেন্দ্রীয় পরিশোধনাগার সম্পূর্ণরূপে চালু না করেই ট্যানারি শিল্পের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী এবং একে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
ট্যানারি বর্জ্যে ধলেশ্বরী ও এর আশপাশের পরিবেশের কী ক্ষতি হচ্ছে, তা পরিবেশ অধিদপ্তর ও বুয়েট পরীক্ষায় উঠে এসেছে। ইতোমধ্যে নদীর পানি দূষিত এবং কালচে হওয়া থেকে শুরু করে মাছ, কৃষিজমিসহ সবুজ পরিবেশের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে। নদী ও পরিবেশ দূষণমুক্ত থাকবে এবং উৎপাদিত বর্জ্য পরিশোধন ও এ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্য নিয়ে সাভারে ট্যানারিশিল্প স্থানান্তর করা হয়েছে, সে লক্ষ্য অধরাই থেকে যাচ্ছে। হাজারীবাগের ২০৫টি ট্যানারি থেকে দৈনিক প্রায় ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য উৎপাদিত হতো। সাভারেও একই পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। সিইটিপির পরিশোধনক্ষমতা প্রায় ২৫ হাজার ঘনমিটার। এ হিসেবে কোনোভাবেই বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীর পানিতে পড়ার কথা নয়। তারপরও দেখা যাচ্ছে, তা নদীতে পড়ে দূষিত করছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, সিইটিপিরই পরিশোধিত যে তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে, তা বিষাক্ত। পরিবেশ অধিদপ্তর ছয়বার এই পানি পরীক্ষা করে একই ফল পেয়েছে। পানিতে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম মাত্রার চেয়ে বেশি। সিইটিপির পরিশোধিত বর্জ্যে এই দূষণ হওয়ার কথা নয়। এমনটি হচ্ছে, সিইটিপি সঠিকভাবে পরিচালনা না করা এবং যারা এর পরিচালনার সাথে যুক্ত তাদের গাফিলতি থাকার কারণে। চীনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা সিইটিপি সবসময় চালায় না এবং ট্যানারির বর্জ্য টেনে নেয় না। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো সিইটিপি চালু করে। এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। উল্লেখ করা প্রয়োজন, সিইটিপি সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত এমন আশ্বাসের ভিত্তিতে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর করানো হয়। এই উসিলায় ট্যানারি মালিকরাও দূষণের দায়দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, একদিকে সিইটিপি পুরোপুরি চালু না হওয়া এবং যতটুকু চালু হয়েছে তা পরিচালনায় উদাসীনতা ও ট্যানারি মালিকদের দায় এড়ানোর কারণেই বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রæটি থেকে যাচ্ছে। এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ায় ধলেশ্বরীকে বুড়িগঙ্গার মতোই ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে ধলেশ্বরীর আশপাশে আরও শিল্পকারখানা রয়েছে যেগুলোর বিষাক্ত বর্জ্যরে কারণেও নদীটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়টির দিকেও খেয়াল রাখা উচিত। তবে ট্যানারি বর্জ্যে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তা একটি নদীর মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট।
বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে ২০০৩ সালে সাভারে ট্যানারি শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ১৯৯ একর জমির উপর এ নগরী গড়ে তোলা হয়। ট্যানারি মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হয় ২৫০ কোটি টাকা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৩৯ কোটি টাকা। এত বিপুল ব্যয়ে ট্যানারিশিল্প নগরী স্থাপন এবং স্থানান্তরের একটিই লক্ষ্য বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো এবং একটি আধুনিক ট্যানারি শিল্প নগরী গড়ে তোলা। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই কালক্ষেপণের কারণে বুড়িগঙ্গা ধ্বংসের কবলে পড়ে। অন্যদিকে স্থানান্তর নিয়ে ট্যানারি মালিকদের নানা টালবাহানা এবং বর্জ্য পরিশোধনের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা চালু না করেই স্থানান্তর কার্যক্রম শুরু হয়। এতে মূল যে লক্ষ্য, তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কোনোরকমে সিইটিপি চালু করা হলেও তা কার্যকর নয়। ট্যানারির কঠিন বর্জ্য ফেলার জন্য পরিবেশ উপযোগী ডাম্পিং ইয়ার্ড বা ভাগাড় এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়নি। ফলে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর পরিস্থিতিও হাজারীবাগের মতো রূপান্তরিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির যদি আশু সুরাহা না হয়, তবে তা যে আশপাশের পরিবেশ দূষণ এবং ধলেশ্বরী নদীটিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে, তাতে সন্দেহ নেই। আমরা আশা করব, অবিলম্বে ট্যানারিশিল্প নগরীর বর্জ্য শোধন এবং ডাম্পিং ব্যবস্থা পরিবেশ বান্ধব করে গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেয়া হবে। সবার আগে সিইটিপি পরিচালনা এবং এর পরিপূর্ণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া অপরিহার্য।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ট্যানারি

২৫ জুলাই, ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ